গল্পের নামঃ হারানো বলয়

হারানো বলয়

লেখকঃ মতিউর রহমান

Writer : Motiur Rahman

আজ শুক্রবার, অফিস ছুটি, তাই সারাটা দিন বাসায় শুয়ে বসে কাটিয়েছি। অতি আয়েশে এক ধরনের ক্লান্তির সৃষ্টি হয়, সেই ক্লান্তিটাকে প্রশান্তির রূপ দিতে বাসা থেকে বের হয়েছি। এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল, দুপুরের কাঠফাটা রোদ ম্লান হয়ে মিষ্টি একধরনের কোমলতা ছড়াচ্ছে চারদিকে। হালকা ঠান্ডা বাতাসে মনটা আবেগি হয়ে উঠেছে। মন চাইছে দুই একটা কবিতা আবৃত্তি করি কিন্তু কবিতা মাথায় আসছে না, আসছে গান। এমন একটা গান, যেটা প্রেমের না বিরহের নাকি জীবনকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার, সেই বিষয়ে আমি নিশ্চত না। আনমনে আমি গানটা গাইতে শুরু করলাম,

-" তুমি আর তো কারো নও শুধু আমার,

-যত দূরে চলে যাও রবে আমার,

-স্তব্ধ সময় টাকে ফেলে রেখে,

-স্মৃতির পাতায় শুধু তুমি আমার,

-কেন আজ এতো একা আমি,

-আলো হয়ে দূরে তুমিই,

-আলো, আলো, আমি কখনো খুজে পাব না,

-চাঁদের আলো তুমি কখনো আমার হবে না

-আলো, আলো, আমি কখনো খুজে পাব না,

-চাঁদের আলো তুমি কখনো আমার হবে না, হবে না।""

গানটা কোন গায়কের গাওয়া আজ আমার মনে পড়ছে না, গানের কথা দীর্ঘ দিন মনে থাকলেও গানের স্রষ্টা কথা অনেক সময় মনে থাকে না। গানটা অনেক আগে শুনে ছিলাম, প্রায় সাত আট বছর হবে।

দীর্ঘ হাঁটাহাটির পর জেলা মডেল থানার সামনে এসে বসলাম হাবিব ভাইয়ের চায়ের দোকানে। হাবিব ভাই আমার বাপের বয়সি, তারপরও আমি উনাকে ভাই বলেই ডাকি। তার এক ছেলে আমার অফিসে টি-বয়ের কাজ করে, সে জন্য হাবিব ভাই আমাকে একটু খাতির করেন। এশহরে হাবিব ভাই ছাড়া আমার তেমন কোনো পরিচিত লোক নেই।

-আসসালামু আলাইকুম স্যার,

ওয়ালাইকুম আসসালাম, তো কেমন চলছে, হাবিব ভাই?

-স্যার, আপনাগো দোয়ায় ভালোই চলতাছে। তয় অন্যদিনের চাইতে আইজ একটু ভালো চলছে।

ওহ, তাই নাকি, কেন?

-স্যার, আজকে থানায় বেবাক লোকের আনাগুনা, থানায় যেদিন লোকজনের আনাগুনা বেশি সেদিন আমার ইনকাম ভালো হয়। স্যারে কি চা খাইবেন? আজকে চায়ের বিল কিন্তু রাখমুনা ফ্রিতে খাইতে হইবে। আপনার মতো মানুষরে ফ্রিতে চা খাওয়ানো তো সাওয়াবের কাজ।

আমি বললাম, একি বলেন হাবিব ভাই, এসব কথা না বলে তাড়াতাড়ি চা দেন

এখন আমি ফুটপাতে তিন পাওয়ালা একটা ভাঙ্গা ব্রেঞ্চিতে বসে, হাবিব ভাইয়ের দেওয়া ফ্রি চা খাচ্ছি আর রাস্তার কর্মব্যস্ত মানুষ গুলোকে গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করছি।

চা প্রায় শেষ এমন সময় হঠাৎ দেখলাম, দুইটা ্যাবের গাড়ি থানায় ঢুকল, তার পিছে পিছে ঢুকল দেশের বিখ্যাত দুই বেসরকারী টিভি চ্যানেল। পরমূহুর্তে হর্ণ বাজাতে বাজাতে প্রায় ৮০-৯০টা মটর সাইকেল ঢুকল থানার ভিতরে। সব সাদা পোশাকি পুলিশ কিংবা হতে পারে ডিভি পুলিশ। হঠাৎ করে এতো পুলিশ দেখে উপস্থিত সবার মধ্যে একটা আতংক অস্তিরতা দেখা দিল, যে কি ব্যাপার, থানায় হঠাৎ করে এতো পুলিশ কেন? সবাই ভয়ে অস্থির, খুশি হওয়ার মধ্যে শুধু হাবিব ভাইই খুশি।

আশপাশ থেকে অনেকেই ছুটে গেল থানার দিকে। ব্যাপার টা কি দেখার জন্য। চায়ের কাপটা রেখে আমিও গেলাম। মিনিট পাচেঁক সময়ের মধ্যে প্রায় শতাধিক মানুষের সমাগম ঘটল থানা প্রাঙ্গনে। সবার মুখে একই প্রশ্ন, কী হয়েছে, কী হয়েছে? কিন্ত, কারোরই কাঙ্ক্ষিত উত্তরটি জানা নেই। এতো মানুষের ভিড়ে কে কাকে চেনে। একটু দূরে একটা বট গাছের তলায় আমার একজন পরিচিত মানুষকে দেখতে পেলাম। উনার নাম মোঃ রাজিব খন্দকার। তিনি ডিভি পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকতা। চাকরি সূত্রে তার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। আমি ভিড় ঠেলে তার সামনে গিয়ে দাড়ালাম।

-আসসালামু আলাইকুম স্যার, কেমন আছেন?

স্যার জবাব দিলেন, "হ্যা, ভালো।" আমি স্যারকে জিজ্ঞাস করলাম,

এখানে কি হয়েছে, একটু কি জানতে পারি স্যার?”

স্যার আমার দিকে একটু বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, আপনারা সাংবাদিকরা এতো জানতে চান কেন ভাই?

তারপর একটার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, একটা ধূর্ত সন্ত্রাসী ধরা পড়েছে। কেউ ভাবতেই পারেনি মানুষটি এতো ভয়াবহ হতে পারে৷ পুলিশের চোখের সামনে গুলি করে দুইটা লোককে হত্যা করেছে। তাও সাধারণ লোক না পুলিশেরই উর্ধ্বতন কর্মকতা। মানুষ মাঝে মাঝে কি করে যে এতো নির্মম হয়, আজ এতো দিন ধরে পুলিশে আছি বুঝতে পারলাম না।

এতোটুকু বলে রাজিব সাহেব নিঃশব্দ হয়ে গেলেন। বুঝতে পারলাম তিনি আর কিছু বলতে পারবেন না। তাই তার কাছে দাড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। এতো বড় দূর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে নিজ চোখে না দেখলে এবং নিজ ক্যামেরায় বন্দি না করলে, সাংবাদিকতার মান থাকেনা। যদিও ক্যামেরা বন্দি করার দায়িত্ব আমার না।

-পুলিশ কোর্য়াটারের একটা রুমে আটকে রাখা হয়েছে, দূর্ধর্ষ সেই সন্ত্রাসীকে, যে কিনা দিনের আলোয়, দুইটি তাজা প্রাণ কে অন্ধকার জগতে পাঠিয়ে দিয়েছে। উৎসুক দর্শক সাংবাদিকবৃন্দ উঁকিঝুকি মারছে পুলিশ কোয়াটারে জানালায়। আমিও তাদের সাথে যোগ দিতে, ভিড় ঠেলে এসে জানালার পাশে দাড়ালাম।

-ঘরের ভিতরটা অন্ধকার তাই স্পষ্টভাবে কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমি জানালার আরো একটু কাছে গেলাম এবং দেখতে পেলাম দূর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর সোনালী রংয়ের লম্বা চুল। দেখে আমি অবাক হলাম। অস্ফুট স্বরে বললাম, সন্ত্রাসী দেখি মেয়ে লোক। আমার পাশের জনতা , আমার স্বরের দ্বিরুক্তি করে বলল, “সন্ত্রাসী না কি মেয়ে লোক সন্ত্রাসী মেয়ে লোক শুনে উৎসুক জনতার মধ্যে একটা অস্তিরতা দেখা দিল।

-এমন সময় পুলিশ র্কোয়াটারের পশ্চিম দিকের একটা জানালা খুলে গেল জনতার টানা টানিতে। আমি মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম সেদিকে সন্ত্রাসীও মাথা তুলে জানালার দিকে তাকালো। সন্ত্রাসীটা মাথা তুলে তাকাতেই যেন আমার মাথার উপর আসমান ভেঙ্গে পড়ল। আমি মনে মনে বলে উঠলাম, “এটা হতে পারে না।আমি আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি ভেবে পাচ্ছি না এই মানুষটি কিভাবে, মানুষ মারতে পারে যে কি না একটা্ পিঁপড়েকে না মেরে ফু দিয়ে উড়িয়ে দিত সে কিনা আজ মানুষ মারল। হঠাৎ করে যেন আমার মাথা এলোমেল হয়ে গেল, কি করব বুঝতে পারছিলাম না৷ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম দূর্ধর্ষ সন্ত্রাসী আমার সেই প্রিয়তমার দিকে। কত স্বপ্ন ছিল তার!

সে বিজ্ঞানী হবে, আবিষ্কার করবে এমন একটি যন্ত্র যেটার মাধ্যমে মানুষের অন্তরের খবর জানা যায়। সে আমার অন্তরের খবর জানতে চায়, এটাই কি তার আবিষ্কার?

-কেন জানি না আমার নিজের অজান্তেই, আমার দুই চোখ জলে পূর্ণ হয়ে গেল। যার জন্য এতো অপেক্ষা তার সাথে হঠাৎ করে এরকম দেখা হবে কখনো ভাবতে পারি নি৷ ছোট একটা অভিমানের কারণে আমরা একে অন্যের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম

-সন্ত্রাসী তার ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে মেঝেতে বসে আছে। আমি তার নাম ধরে ডাকলাম,

" ফুলি, ওফুলি, আমি তোমার মতি।" ফুলি মাথা তুলে চার দিকে তাকালো। বোধ হয় আমাকে দেখতে পায় নি। আমি আবার ডাকলাম, “ফুলি, ওফুলি!” এবার সে আমাকে দেখতে পেয়েছে

-আমাকে দেখে তার বুকে যেন একটা সাহস সঞ্চারিত হয়েছে, মুখে অস্ফুট হাসির রেখা আর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠছে। কিন্তু পরক্ষনেই মুখের হাসি, চোখের উজ্জ্বল আভা অপরাধের আড়ালে হারিয়ে গেল। কিছু না বলেই আবার মাথা নামিয়ে নিল ফুলি। পশ্চিমের খোলা জানালা দিয়ে তির্যক ভাবে বিকেলের ম্লান সূর্যের আলো এসে ছড়িয়ে পড়ছে ফুলির সোনালী চুলে। এমন সময় এক দারোগা দুই মহিলা কনস্টেবল এসে ঢুকল পুলিশ কোয়াটারে। তার কিছু পরে ফুলিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। যাওয়ার বেলা ফুলি ঘাড় ফিরিয়ে আমার দিকে একবার তাকাল। আমি স্পষ্ট দেখলাম ফুলির গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে।

মুহুর্তে ভবিষ্যতের চাদরে হারিয়ে গেল আমার সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটি


টাইপিং আছি আমি মতিউর রহমান। জীবনে লেখক  হতে চাই কিনা জানি না তবে লেখা লেখি করতে চাই।

Next Post
No Comment
Add Comment
comment url