গল্পের নামঃ মা
ছুটন, ছুটন ওছুটন, ছুটনরে, বাবা, ওবাবা, সেহরির সময় হয়েছে।
ছুটন আধ-শোয়া অবস্থায়, জবাব দিল "ওঠছি মা, আর একটু ঘুমাই।"
মা চলে গেলেন রান্না ঘরে।মায়ের কাজই যেন সারা জীবন ধরে রান্না করা। মনে হয় যেন মায়েরা সেই জন্মের পর থেকেই রান্নাই করছেন। ভাত, মাছ, ডাল, সবজি এগুলোই যেন তাদের জীবন। আর মায়েরা এসব করেন বলেই হয়তো তারা মা। এই যে মা ছুটনের ঘুম ভাঙ্গাচ্ছেন, ছুটন বলছে ওঠছি মা, বলেই সে আবার ঘুমিয়ে পড়ছে। মা আবার ডাকছেন,
ছুটন, ওছুটন, ছুটনরে আযান পরে যাবেরে বেটা, সেহরি তো তুই খেতে পারবি না।”
বিরক্তিহীন এই ডাকাডাকিতে কতটা ভালোবাসো জরিয়ে আছে, যদি কেউ মা না হয় তাহলে বুঝতে পারবে না। মায়েদের নিজেস্ব কোনো স্বপ্ন থাকেনা, মায়ের স্বপ্ন শুধু তার সন্তান। তার স্বপ্ন আমার সন্তান অনেক বড় হবে, পৃথিবী জুরে বিচরন করার ক্ষমতা থাকবে, আকাশ চুম্ভি সম্মান আর মানুষের মুখে তার সন্তানেরই গুণগান শুনতে চায়। মা কখোন সন্তানের উপর বিরক্ত হন না। যদি হনও তাহলে সেই বিরক্তির মাঝে ভাবাবাসা জরিয়ে থাকে। যেটা কে বলা যায় টক-জাল- মিষ্টি।
মসজিদে মাওলানা সাহেব ঘোষণা করলেন, “আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি।আপনারা তাড়াতাড়ি সেহরি শেষ করে মসজিদে চলে আসুন ।“
মা আবার ছুটনকে ডাকছেন, ছুটন, ছুটন, ছুটনরে, ওবেটা ছুটন ওঠ, ওঠরে মাত্র বিশ মিনিট বাকি তাড়াতাড়ি ওঠ। সময় শেষ হয়ে গেল, সেই কখন থেকে ডাকছি। তখনও ছুটন ঘুম থেকে ওঠতে চাইছে না। সে বলছে,
“আর একটু ঘুমাই মা।” তখন মা একটু রেগে গিয়ে মা ডাকেন,
“হেই ছুটন, ওঠ ওঠরে, বেটা সারা দিন মোবাইল টিপানি, আর গেইম, গান নিয়া ব্যস্ত আর এখন ঘুমাইয়া ডাটটা।”
ছুটন ঘুম থেকে উঠল অতন্ত্য রাগান্বিত হয়ে, ঘুম থেকে উঠার পর ছটনের মাথায় পৃথিবীর সমস্ত রাগ এক সাথে চেপে বসে। মনে হয় যেন পৃথিবীতে এই রকম রাগ আর কোনো দিন সে করে নি। কিন্তু না এটাই তার জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক
ব্যাপার। সে যদিও বাহিরে থেকে রাগরাগ চেহারা নিয়ে দাড়িয়ে আছে কিন্তু না, সে ভিতরে ভিতরে মায়ের এসব কমর্কান্ড দেখে হাসছে। মাঝে মাঝে সে যখন একলা বসে নিজের কাজ করে তখন মায়ের এসব কর্মকান্ডের কথা মনে পরলে, সে মুচকি হাসে। সেই হাসিটাই যেন মায়ের ভালোবাসার পরশ।
ছুটন, হেই ছুটন, এখানে দাড়িয়ে আছিশ কেন? সময় নেই দেখচিস না। এই নে পানি মুখ ধৌ, তাড়াতাড়ি। আযান পরে যাবে, পরে খেতে পারবি না, সারা দিন কষ্ট পাবি।
ছুটনের হাতে পানি ধরিয়ে দিয়ে, মা দৌড়ে যান ছোট ভাই লিটন কে ডাকতে। তারপর বাবাকে, বোন ফাতেমা কে, সাবাইকে ডাকা যেন তার ফরজ কাজের মধ্য পড়ে। ফরজ কাজের একটু হেরফের হলে একজন মুমিনের মন হাহাকার করে ওঠে। মায়েরও যেন এই সব কাজে একটু এদিক সেদিক ঘটে তার মন ডুকরে কেঁদে উঠে।
"ওমাইজা বেটার বউ, বউ, ওবেটি, উঠছনি গো মা, সেহরির সময় তো শেষ হই গেল।" মা এখন পাশের বাসার মেজো ভাবিকে ডাকছে। মায়ের দায়িত্ব যেন বাড়ির মানুষকে জাগিয়ে তুলা। রমজানে এমন কোনো দিন নেই যে, পাশের বাসার ভাভিকে তিনি ডাকেন নাই।
বাবা, ভাই, বোন, সবাই যখন এসে টেবিলে বসেছি, বাহ কি রাজকীয় ব্যবস্থা, শুধু মাত্র আমরা খাবার গুলো মুখে দেব আর পেটে যাবে এমন অবস্থা। এমন সময় মা বললেন,
“ওছুটন ছুটনরে তর দাদু কৈ, খেতে আসেন নাই বলেই ছুট, দাদুর রুমে, মা ওমা, আর সময় তো বেশি নাই, আসেন তাড়াতাড়ি আসেন।”
সবাই টেবিলে বসে খাচ্ছি, খাবার দাবার এগিয়ে দিচ্ছেন সাবই কে। হঠাৎ ছুটন বললো, "মা তুমি খাচ্ছ না কেন? সময় তো শে হয়ে গেল।"
মা রাগ করে বলে, " পেট ভরে খা, আমার খাবার আমি খাব, খা তাড়াতাড়ি খা, আরো ভাতনে।"
সবার খাওয়া-দাওয়া প্রায় শেষ এমন সময় মা খেতে বসলেন, মনে হয় একমোটও ভাত পেটে যেতে পারে নি। মসজিদে মাওলানা সাহেব ঘোষণা করলেন,
"সেহরির সময় শেষ আপনারা সেহরি বন্ধ করুন।"
মা প্রায় খালি পেটে, এক গ্লাস পানি খেয়ে সেহরি শেষ করলেন। ছুটন মায়ের দিকে অপলক দৃষ্টিতে থাকিয়ে আছে। লিটন চিৎকার করছে,
মা, ওমা, আমি পেসাব করব, আমাকে টয়লেটে নিয়ে চল।” ছুটন জানে যে মায়ের প্রতিদিনই এরকম যায়।
আজ ছুটন দেশের একজন রাষ্ট্রদুত হয়ে লেবাননের রাজধানী বৈরুত শহরে বসবাস করছে। রাতে যখন সে বসে কাজ করে তখন মায়ের সেই ডাকা ডাকির দিন গুলার কথা মনে পড়ে। কাজে ফাকে ফাকে সে মুচকি হাসে, তার কানে ভেসে আসে, মায়ের সেই ডাক, ছুটন, ওছুটন, ছুটনরে। এমন সময় ওয়ার্ড বয় এসে বলল, স্যার সেহরির সময় তো শেষ হয়ে যাচ্ছে খাবেন না।ওযার্ড বয়ের ডাক শুনে। হঠাৎ ছুটনের চোখের কোনায় দুফোটা জল জমা হলো। কেন চোখে জল আসলো ছুটন তা জানে না।
